জন্ম সূত্রে হেরে গেলেও জীবন যুদ্ধে হার না-মানা এক তরুণের গল্প।latest bd news
![]() |
মা-বাবার পরিচয় জানেন না জুনাইদ। তাই তিনি জন্মের পর থেকে চিনতে শুরু করেছেন নিষ্ঠুরতম এক পৃথিবীকে। শৈশব থেকেই টিকে থাকার জন্য করেছেন অমানুষিক পরিশ্রম। এখন সে পড়া-লেখা করছে সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে।
অনুপ্রেরণার গল্প
জুনাইদের কাছে ছিল ''মা-বাবা'' নামক কঠিন দুই শব্দ। তাঁর বয়স যে ঠিক কত, জুনাইদ নিজেও জানেন না। না-জানা বয়সী এ জীবনে কখনো কাউকে মা-বাবা বলে ডাকার সৌভাগ্য তাঁর কখনো হয়নি। বোধবুদ্ধি হওয়ার পর নিজেকে সে আবিষ্কার করেছিলেন কক্সবাজারের ঝাউতলা নামক একটি স্থানে । জুনাইদকে হয়তো পথেই পেয়েছিলেন নাজিরাটেকের নিঃসঙ্গ বৃদ্ধ সাহারা খাতুন নামক এক বৃদ্ধ মহিলা । তিনি শুঁটকির আড়তে কাজ করতেন ,এবং শীতকালে পিঠা বেচতেন।
জুনাইদ সাহারা খাতুনকে নানি বলে ডাকত। জুনাইদ তাঁর আশ্রয়ে থাকার সময় লাকড়ি জোগাড় করা, শুঁটকি শুকানোর মতো কাজ করত। জুনাইদের বয়স যখন পাঁচ-ছয়, তখন একদিন হঠাৎ সাহারা খাতুন চিরবিদায় নিলেন। এর ফলে জুনাইদ হারাল মাথাগোঁজার ঠাঁইটুকুও। জুনাইদ ফিরে গেল তাঁর সেই চির-চেনা পুরোনো ঠিকানায়—"পথে বা রাস্তায় ""। অনুপ্রেরণার গল্প
এরপর পথে নেমে শুরু করল কাগজ কুরাতে। ঘুমাত খোলা আকাশের নিচে—মাটিতে। কপাল খুব ভালো থাকলে কোনোদিন ছাউনির নিচে বা মেঝেতে ঘুমাত। এবং, তার বিশেষ খাবার ছিল যে সমুদ্রে ঘুরতে যাওয়া পর্যটকের ফেলে দেওয়া বিভিন্ন খাবার। এভাবে বছর দু-এক কেটে গেলে। জুনাইদ একটি চায়ের দোকানে কাজ পেল। তার ছোট্ট জীবনে সেটিই ছিল বড় প্রাপ্তি। কারন,জুনাইদের চালচুলো নেই বলে লোকে দূর দূর করে তাড়িয়ে দিত। সবাই ভাবত কাজ দিলে সব নিয়ে যদি ভেগে যায়, তখন কোথায় পাবে তাকে। কিন্তু জুনাইদ সাড়ে তিন বছরে একাধিক দোকানে কাজ করে নিষ্ঠার সঙ্গে। সে কারও কাছে হাত পাতল না, কারও কিছু চুরিও করল না। তারপরও মানুষ তাঁকে উঠতে-বসতে বিভিন্ন ভাবে গালাগাল দিত কিংবা মারধর করত! জুনাইদ ভেবেছিল, এটাই বুঝি নিষ্ঠুর পৃথিবীর নিয়ম। ওই নিয়মে নিজেকে আর মানিয়ে নিতে পারছিল না জুনাইদ।
অনুপ্রেরণার গল্প
এরপরে জুনাইদ ২০১০-১১ সালে গেল টেকনাফের হ্নীলা নামক একটি ইউনিয়নে। তার সাথে এক জেলে পরিবারের চুক্তি হলো। সমুদ্রে মাছ ধরতে যাবে, মাছ ধরার কাজ না থাকলে পাহাড় থেকে লাকড়ি এনে দেবে এবং এর বিনিময়ে তাকে থাকা-খাওয়া দিবে । জুনাইদ খুশি মনে রাজি হলো ।এরপর থেকে সমুদ্রে রাত জেগে নৌকা বেয়ে , জাল পেতে মাছ ধরে শুরু করে ।
আবার মাঝেমধ্যে পাহাড়ে যায়, লাকড়ি জোগাড় করে এনে হাটে বেচে টাকা বুঝিয়ে দেয় জেলে পরিবার কে। এছাড়াও সে সুযোগ পেলেই বাজারের চায়ের দোকানের বাঁশের বেড়ার ফাক দিয়ে সিনেমা দেখত। তত দিনে তার সিনেমা দেখার বেজায় নেশা ধরে গেছে । সে বাংলা-হিন্দি-ইংরেজি—সব সিনেমাই দেখত । তবে সিনেমা দেখার নিয়ম হলো, পয়সা দিয়ে চা-নাশতা খেতে বসলেই কেবল সিনেমা দেখতে পাবে । তাই দোকানদার মাঝে মধ্যে যখন জুনাইদ বেড়ার ফুটোতে চোখ দিয়ে দেখলেই "তাকে পানি মারত,কখনো আবার ধাওয়া করত"। এত কিছুর মধ্যেও জুনাইদ আমির খানের থ্রি ইডিয়টস ছবি টি সম্পূর্ণ দেখে ফেলেছে । এবং জুনাইদ ‘এই সিনেমাটা দেখে পড়াশোনার উপরে খুব আগ্রহ হয়। সে মাঝে-সাজে স্কুল আর কলেজের ছাত্রছাত্রীদের দেখলেই মনে হতো, ইশ্! আমিও যদি এমন ভাবে পড়তে পারতাম!
অনুপ্রেরণার গল্প
তার অই ইচ্ছে আরো বাড়িয়ে দিয়ে গেল তার সমুদ্রের এক বন্ধু,সেই বন্ধুটির নাম ছিল জুবায়ের। বয়সে জুবায়ের জুনাইদের ছোটই ছিল, জুবায়ের পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ে বিরতি নিয়েছিল।এবং সেও জুনাইদ এর মতো সমুদ্রে মাছ ধরতে যেত । জুবায়ের হঠাৎ একদিন জুনাইদ কে বলল, "আর মাছ ধরতে আসবে না, আবার স্কুলে যাবে"।এই কথা শুনে জুনাইদ বলল, "আমিও তো স্কুলে যাইতে চাই। তুই একটা ব্যবস্থা করবি আমার জন্য?"
তখন তার বন্ধু তাকে দিল জাহাঙ্গীর স্যার এর ঠিকানা।তার বন্ধু বলল, "জাহাঙ্গীর স্যার খুবই ভালো মানুষ। তাঁর কাছে গিয়ে বুঝায়া বললে ব্যবস্থা হবে"।
এরপর.... অনুপ্রেরণার গল্প
অবশেষে জাহাঙ্গী-স্যার ঠিকই একটা ব্যবস্থা করে দিলেন। এবং জুনাইদকে নুরুল আমিন নামক আরেক ছাত্রের কাছে পাঠালেন । তারপর জুনাইদ অনেক কষ্টে জমানো নিজের১০ টাকা দিয়ে দুইটি বই "বাংলা শিক্ষা ও মাই স্পেলিং বুক" কিনেছিল।
তারপর থেকে সে রাত জেগে মাছ ধরত, আর সুযোগ পেলেই কুপির আলোতে নৌকায় খুলে বসত তার বই দুটি নিয়ে । সে দিনেও ঘুমাত না, বরং সে বই খুলে বসত। জুনাইদ ঠিক ১০ দিনে দুটি বই-ই পড়ে শেষ করল। এছাড়াও সে একশ টার মতো ইংরেজি শব্দও শিখে ফেলে। আর মাঝেমধ্যে জাহাঙ্গীর স্যার যেখানে প্রাইভেট পড়াতেন সেখানে যেত।সেখানে পাশে দাঁড়িয়ে থেকেই ৪৫ ডিগ্রি কোণ আঁকাও শিখে ফেলে ছিল। তারপর একদিন স্যারকে বলে, "স্যার_ আমিও পরীক্ষা দেব"। স্যার রাজি হলেন। প্রাইভেটের ওই পরীক্ষায় জুনাইদ দ্বিতীয় হয়।
অনুপ্রেরণার গল্প
এবং এমন পরিক্ষার ফলাফল দেখে স্যার অবাক যায়। তাই হয়তো তিনি জুনাইদকে স্কুলে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দিলেন। কিন্তু স্যারের পরামর্শ শুনে ওই জেলে পরিবার ভীষণ বেঁকে বসল। জুনাইদ নৌকায় একটা পড়ার টেবিলের মতো বানিয়ে ছিল , সেটাও লাথি মেরে পানিতে ফেলে দেয়। আর জেলে পরিবার বলে , ‘শখ কত!’
অনুপ্রেরণার গল্প
এরপর জুনাইদ ২০১২ সালের জানুয়ারি মাসে মাছ ধরার কাজে বিরতি দিল । তারপর থেকে কাঠমিস্ত্রির কাজ শুরু করে। সেই কাজ থেকে সে উপার্জন করল ১ হাজার ৬০০ টাকা। ওই টাকা নিয়ে , জাহাঙ্গীর স্যারের সুপারিশ আর বুকভরা সাহস নিয়ে গেল টেকনাফের মৌসুনী দ্বীপের ল্যাদা জুনিয়র হাইস্কুল নামক স্কুলে । অনেক অনুরোধের পর, ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে জুনাইদ ভর্তি হলো ৮ম শ্রেণিতে। এবং তার নিজের টাকায় সে বই, স্কুলের পোশাক কিনেছিল। কিন্তু তাকে খেয়ে-পরে বাঁচতে তো হবে। তাই সে আবারও গেল মাছ ধরতে। সারা রাত মাছ ধরে কোনোরকমে স্কুল ড্রেস পরে, বই-খাতা নিয়ে ছুটে যেতে লাগল স্কুলের অ্যাসেম্বলিতে। আর বাকি ছাত্রছাত্রীরাও তাকে দেখে জায়গা করে দিতে লাগল । কারন,"জুনাইদ গোসল না করেই স্কুলে যেত ,এর ফলে শরীরে মাছের ভয়ানক গন্ধ লেগে থাকত।আর সে কারণেই ওরা জায়গা করে দিত।"
এই করেই জুনাইদ একদিন JSC পরীক্ষায় পেল GPA-5 !
অনুপ্রেরণার গল্প
এরপর ৯ম শ্রেণিতে পা রাখার আগে সে ইটভাটায় কাজ নিল । এর মাঝেও কাঠমিস্ত্রির কাজও করল। ৩ হাজার টাকা জোগাড় হওয়ার পর গেল টেকনাফের হ্নীলা হাইস্কুলে। সেখানে সে ভর্তি হল । প্রধান শিক্ষক তাঁর ভাইয়ের বাসায় জায়গির হিসেবে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিলেন। সেখানে তাকে ছোট দুটি শিশুকে পড়াতে হতো। কিন্তু ছয় মাসের বেশি সেখানে টিকতেই পারি নি। এরপর সে স্কুলের Hostel এ থাকা শুরু করে।কিন্তু সে সকালে নৌকা থেকে ফিরে সময়মতো অ্যাসেম্বলি ধরতে পারত না। তাই কিছু শিক্ষকেরা চেপে ধরলেন, সমস্যা কী তোর? হোস্টেলে থেকেও স্কুলে আসতে দেরি হয় কেন?
অনুপ্রেরণার গল্প
জুনাইদের কাছে ছিল ''মা-বাবা'' নামক কঠিন দুই শব্দ। তাঁর বয়স যে ঠিক কত, জুনাইদ নিজেও জানেন না। না-জানা বয়সী এ জীবনে কখনো কাউকে মা-বাবা বলে ডাকার সৌভাগ্য তাঁর কখনো হয়নি। বোধবুদ্ধি হওয়ার পর নিজেকে সে আবিষ্কার করেছিলেন কক্সবাজারের ঝাউতলা নামক একটি স্থানে । জুনাইদকে হয়তো পথেই পেয়েছিলেন নাজিরাটেকের নিঃসঙ্গ বৃদ্ধ সাহারা খাতুন নামক এক বৃদ্ধ মহিলা । তিনি শুঁটকির আড়তে কাজ করতেন ,এবং শীতকালে পিঠা বেচতেন।
জুনাইদ সাহারা খাতুনকে নানি বলে ডাকত। জুনাইদ তাঁর আশ্রয়ে থাকার সময় লাকড়ি জোগাড় করা, শুঁটকি শুকানোর মতো কাজ করত। জুনাইদের বয়স যখন পাঁচ-ছয়, তখন একদিন হঠাৎ সাহারা খাতুন চিরবিদায় নিলেন। এর ফলে জুনাইদ হারাল মাথাগোঁজার ঠাঁইটুকুও। জুনাইদ ফিরে গেল তাঁর সেই চির-চেনা পুরোনো ঠিকানায়—"পথে বা রাস্তায় ""। অনুপ্রেরণার গল্প
এরপর পথে নেমে শুরু করল কাগজ কুরাতে। ঘুমাত খোলা আকাশের নিচে—মাটিতে। কপাল খুব ভালো থাকলে কোনোদিন ছাউনির নিচে বা মেঝেতে ঘুমাত। এবং, তার বিশেষ খাবার ছিল যে সমুদ্রে ঘুরতে যাওয়া পর্যটকের ফেলে দেওয়া বিভিন্ন খাবার। এভাবে বছর দু-এক কেটে গেলে। জুনাইদ একটি চায়ের দোকানে কাজ পেল। তার ছোট্ট জীবনে সেটিই ছিল বড় প্রাপ্তি। কারন,জুনাইদের চালচুলো নেই বলে লোকে দূর দূর করে তাড়িয়ে দিত। সবাই ভাবত কাজ দিলে সব নিয়ে যদি ভেগে যায়, তখন কোথায় পাবে তাকে। কিন্তু জুনাইদ সাড়ে তিন বছরে একাধিক দোকানে কাজ করে নিষ্ঠার সঙ্গে। সে কারও কাছে হাত পাতল না, কারও কিছু চুরিও করল না। তারপরও মানুষ তাঁকে উঠতে-বসতে বিভিন্ন ভাবে গালাগাল দিত কিংবা মারধর করত! জুনাইদ ভেবেছিল, এটাই বুঝি নিষ্ঠুর পৃথিবীর নিয়ম। ওই নিয়মে নিজেকে আর মানিয়ে নিতে পারছিল না জুনাইদ।
অনুপ্রেরণার গল্প
এরপরে জুনাইদ ২০১০-১১ সালে গেল টেকনাফের হ্নীলা নামক একটি ইউনিয়নে। তার সাথে এক জেলে পরিবারের চুক্তি হলো। সমুদ্রে মাছ ধরতে যাবে, মাছ ধরার কাজ না থাকলে পাহাড় থেকে লাকড়ি এনে দেবে এবং এর বিনিময়ে তাকে থাকা-খাওয়া দিবে । জুনাইদ খুশি মনে রাজি হলো ।এরপর থেকে সমুদ্রে রাত জেগে নৌকা বেয়ে , জাল পেতে মাছ ধরে শুরু করে ।
আবার মাঝেমধ্যে পাহাড়ে যায়, লাকড়ি জোগাড় করে এনে হাটে বেচে টাকা বুঝিয়ে দেয় জেলে পরিবার কে। এছাড়াও সে সুযোগ পেলেই বাজারের চায়ের দোকানের বাঁশের বেড়ার ফাক দিয়ে সিনেমা দেখত। তত দিনে তার সিনেমা দেখার বেজায় নেশা ধরে গেছে । সে বাংলা-হিন্দি-ইংরেজি—সব সিনেমাই দেখত । তবে সিনেমা দেখার নিয়ম হলো, পয়সা দিয়ে চা-নাশতা খেতে বসলেই কেবল সিনেমা দেখতে পাবে । তাই দোকানদার মাঝে মধ্যে যখন জুনাইদ বেড়ার ফুটোতে চোখ দিয়ে দেখলেই "তাকে পানি মারত,কখনো আবার ধাওয়া করত"। এত কিছুর মধ্যেও জুনাইদ আমির খানের থ্রি ইডিয়টস ছবি টি সম্পূর্ণ দেখে ফেলেছে । এবং জুনাইদ ‘এই সিনেমাটা দেখে পড়াশোনার উপরে খুব আগ্রহ হয়। সে মাঝে-সাজে স্কুল আর কলেজের ছাত্রছাত্রীদের দেখলেই মনে হতো, ইশ্! আমিও যদি এমন ভাবে পড়তে পারতাম!
অনুপ্রেরণার গল্প
তার অই ইচ্ছে আরো বাড়িয়ে দিয়ে গেল তার সমুদ্রের এক বন্ধু,সেই বন্ধুটির নাম ছিল জুবায়ের। বয়সে জুবায়ের জুনাইদের ছোটই ছিল, জুবায়ের পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ে বিরতি নিয়েছিল।এবং সেও জুনাইদ এর মতো সমুদ্রে মাছ ধরতে যেত । জুবায়ের হঠাৎ একদিন জুনাইদ কে বলল, "আর মাছ ধরতে আসবে না, আবার স্কুলে যাবে"।এই কথা শুনে জুনাইদ বলল, "আমিও তো স্কুলে যাইতে চাই। তুই একটা ব্যবস্থা করবি আমার জন্য?"
তখন তার বন্ধু তাকে দিল জাহাঙ্গীর স্যার এর ঠিকানা।তার বন্ধু বলল, "জাহাঙ্গীর স্যার খুবই ভালো মানুষ। তাঁর কাছে গিয়ে বুঝায়া বললে ব্যবস্থা হবে"।
এরপর.... অনুপ্রেরণার গল্প
অবশেষে জাহাঙ্গী-স্যার ঠিকই একটা ব্যবস্থা করে দিলেন। এবং জুনাইদকে নুরুল আমিন নামক আরেক ছাত্রের কাছে পাঠালেন । তারপর জুনাইদ অনেক কষ্টে জমানো নিজের১০ টাকা দিয়ে দুইটি বই "বাংলা শিক্ষা ও মাই স্পেলিং বুক" কিনেছিল।
তারপর থেকে সে রাত জেগে মাছ ধরত, আর সুযোগ পেলেই কুপির আলোতে নৌকায় খুলে বসত তার বই দুটি নিয়ে । সে দিনেও ঘুমাত না, বরং সে বই খুলে বসত। জুনাইদ ঠিক ১০ দিনে দুটি বই-ই পড়ে শেষ করল। এছাড়াও সে একশ টার মতো ইংরেজি শব্দও শিখে ফেলে। আর মাঝেমধ্যে জাহাঙ্গীর স্যার যেখানে প্রাইভেট পড়াতেন সেখানে যেত।সেখানে পাশে দাঁড়িয়ে থেকেই ৪৫ ডিগ্রি কোণ আঁকাও শিখে ফেলে ছিল। তারপর একদিন স্যারকে বলে, "স্যার_ আমিও পরীক্ষা দেব"। স্যার রাজি হলেন। প্রাইভেটের ওই পরীক্ষায় জুনাইদ দ্বিতীয় হয়।
অনুপ্রেরণার গল্প
এবং এমন পরিক্ষার ফলাফল দেখে স্যার অবাক যায়। তাই হয়তো তিনি জুনাইদকে স্কুলে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দিলেন। কিন্তু স্যারের পরামর্শ শুনে ওই জেলে পরিবার ভীষণ বেঁকে বসল। জুনাইদ নৌকায় একটা পড়ার টেবিলের মতো বানিয়ে ছিল , সেটাও লাথি মেরে পানিতে ফেলে দেয়। আর জেলে পরিবার বলে , ‘শখ কত!’
অনুপ্রেরণার গল্প
এরপর জুনাইদ ২০১২ সালের জানুয়ারি মাসে মাছ ধরার কাজে বিরতি দিল । তারপর থেকে কাঠমিস্ত্রির কাজ শুরু করে। সেই কাজ থেকে সে উপার্জন করল ১ হাজার ৬০০ টাকা। ওই টাকা নিয়ে , জাহাঙ্গীর স্যারের সুপারিশ আর বুকভরা সাহস নিয়ে গেল টেকনাফের মৌসুনী দ্বীপের ল্যাদা জুনিয়র হাইস্কুল নামক স্কুলে । অনেক অনুরোধের পর, ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে জুনাইদ ভর্তি হলো ৮ম শ্রেণিতে। এবং তার নিজের টাকায় সে বই, স্কুলের পোশাক কিনেছিল। কিন্তু তাকে খেয়ে-পরে বাঁচতে তো হবে। তাই সে আবারও গেল মাছ ধরতে। সারা রাত মাছ ধরে কোনোরকমে স্কুল ড্রেস পরে, বই-খাতা নিয়ে ছুটে যেতে লাগল স্কুলের অ্যাসেম্বলিতে। আর বাকি ছাত্রছাত্রীরাও তাকে দেখে জায়গা করে দিতে লাগল । কারন,"জুনাইদ গোসল না করেই স্কুলে যেত ,এর ফলে শরীরে মাছের ভয়ানক গন্ধ লেগে থাকত।আর সে কারণেই ওরা জায়গা করে দিত।"
এই করেই জুনাইদ একদিন JSC পরীক্ষায় পেল GPA-5 !
অনুপ্রেরণার গল্প
এরপর ৯ম শ্রেণিতে পা রাখার আগে সে ইটভাটায় কাজ নিল । এর মাঝেও কাঠমিস্ত্রির কাজও করল। ৩ হাজার টাকা জোগাড় হওয়ার পর গেল টেকনাফের হ্নীলা হাইস্কুলে। সেখানে সে ভর্তি হল । প্রধান শিক্ষক তাঁর ভাইয়ের বাসায় জায়গির হিসেবে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিলেন। সেখানে তাকে ছোট দুটি শিশুকে পড়াতে হতো। কিন্তু ছয় মাসের বেশি সেখানে টিকতেই পারি নি। এরপর সে স্কুলের Hostel এ থাকা শুরু করে।কিন্তু সে সকালে নৌকা থেকে ফিরে সময়মতো অ্যাসেম্বলি ধরতে পারত না। তাই কিছু শিক্ষকেরা চেপে ধরলেন, সমস্যা কী তোর? হোস্টেলে থেকেও স্কুলে আসতে দেরি হয় কেন?
জুনাইদ তবুও তার শিক্ষকদের কাছে তার সত্যি কথা কখনো বলেনি। এই একই কাজ সে করেছিল আগের স্কুলেও। কারন,একটাই ছিল তার বাবার-মার কোনো পরিচয় নেই। আর এমন কোনো ছেলেকে কেউ সুনজরে দেখে না। এরপর জুনাইদ বাধ্য হয়ে তার শিক্ষকের কাছে সব খুলে বলে। এবং তার পর থেকে তাকে কোনো কোনো শিক্ষক সুযোগ পেলেই বিষয়টি মনে করিয়ে দিতেন! তবে , এর মধ্যে ভালো শিক্ষকের সংখ্যাই বেশি। তাঁরা না থাকলে তো এতটুকু পথ আসতে পারত না জুনাইদ । স্কুলের বেতন, পরীক্ষা ও রেজিস্ট্রেশন ফি—সবই তাঁরা দিয়েছেন। এভাবেই জুনাইদ SSC তে বিজ্ঞান বিভাগে(Science) GPA-4.83 পায়।
এরপর জুনাইদ ভর্তি হয় ''উখিয়া ডিগ্রি কলেজে'' নামক এক কলেজে । জুনাইদ কলেজে পড়ার টাকা জোগাড় করতে শুরু করল রাজমিস্ত্রির কাজ করে। এর ফলে ক্লাস শুরু হওয়ার ঠিক এক মাসের মাথায় গিয়ে কলেজে যাওয়ার সুযোগ পায়। এরপরও জুনাইদ জায়গির থাকলেন। কলেজের পক্ষ থেকে কলেজের বেতন মওকুফ করে দিল। তারপর জুনাইদ টিউশানি শুরু করল। জুনাইদ নিজে কিন্তু কখনো কারও কাছে কোনো প্রাইভেট পড়ার সুযোগ হয়নি। এরপর জুনাইদ একদিন তার বন্ধুদের মেসে উঠল । তার জন্য থাকা-খাওয়া ফ্রি, শুধু তার বন্ধুদের পড়াশোনায় সাহায্য সহযোগিতা করতে হতো।
জুনাইদ—২০১৭ সালের ৩০ মার্চ। দুদিন পর জুনাইদের HSC পরীক্ষা।জুনাইদ ঠিক করল, স্কুলের শিক্ষকদের কাছ থেকে দোয়া নিয়ে আসবে। এই উদ্দেশ্যে উঠে বসলেন অটোরিকশায়। খানিক বাদেই ভয়াবহ এক ভয়াবহ সড়ক-দুর্ঘটনা ঘটে । এতে জুনাইদ সহ আরও চার যাত্রীর মধ্যে দুজন মৃত্যুর কোলে ঢলে পরে । জুনাইদের অবস্থাও সাংঘাতিক। তার পেট ফুঁড়ে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বেরিয়ে গেছে। চোখ আর মাথায় কঠিন আঘাত। এছাড়াও তার শরীরের প্রায় হাড়ই ভেঙে গেছে। তার বন্ধুরা ছুটে এলেন। অ্যাম্বুলেন্সে তাকে চট্টগ্রাম নিয়ে যাওয়ার পথে চিকিৎসকেরা জানিয়ে দিলেন, জুনাইদ আর নেই, তার হৃদ্ যন্ত্র থেমে গেছে। অ্যাম্বুলেন্সটি উখিয়ায় ফিরে আসছিল । কিছু দূর যাওয়ার পর জুনাইদের হৃৎপিণ্ড জানান দিল, এখনো থামিনি সে বেচে আছে ! মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এলো জুনাইদ। এর মধ্যে HSC শুরু হয়ে গেল। কিন্তু তার পরীক্ষা দেওয়ার তো প্রশ্নই আসে না।
অনুপ্রেরণার গল্প
এরপর প্রায় ১ বছর চট্টগ্রাম মেডিকেল হাসপাতাল ও কুতুপালংয়ের এক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে থাকার পর নিজের পায়ে দাঁড়াতে সক্ষম হয়।এর মাঝে তো জুনাইদ শুনেছিল, সে জীবনে আর চোখ মেলে তাকাতে পারবেন না, পা দুটিও চলবে না। , তার বন্ধুবান্ধব, কলেজের শিক্ষকেরা না থাকলে হয় তো জুনাইদ মরেই যেত। অবিশ্বাস্যভাবে ফিরে এসেছিল জুনাইদ। হয়তো তার স্বপ্ন পূরণের জন্যই ওপরওয়ালা আবার তাকে বাঁচিয়ে রেখেছে।‘যে সময় সবাই মা-বাবার আদরে পড়াশোনা করে, সে সময় জুনাইদ অসুস্থ শরীরে ইট ভেঙে খাবার জোগাড় করেছিল, ভাঙা পা ড্রেসিং করে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে ছিল ।
আবারও জুনাইদ ১ বছর পর, ২০১৮ সালে HSC পরীক্ষা দিতে বসে।
এত কিছু করে জুনাইদ HCS তে GPA-4.50 পেয়েছিল। তারপর বন্ধুবান্ধব, শিক্ষকদের সহযোগিতায় পরীক্ষা দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ে। জুনাইদ সুযোগ পেয়েছিল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু অবশেষে জুনাইদ বেছে নেয় শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের যন্ত্রকৌশল বিষয়টি। কারণ,? তার স্বপ্ন ছিল সে একদিন ইঞ্জিনিয়ার হবে।
অনুপ্রেরণার গল্প
জুনাইদের জীবনের সবচেয়ে সুখের স্মৃতি হলো "‘অ্যাকসিডেন্টের পর যেদিন চোখ মেলে তাকাতে পেরেছিল , সে স্মৃতিটা তার খুব আনন্দের ছিল । এছাড়াও সে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির সুযোগ পাওয়ার স্মৃতিটাও ছিল।
_____ওই যে ছোটবেলায় সমুদ্রে নৌকায় একজনকে বলেছিল ইঞ্জিনিয়ার হব, তার সেই মনের অদম্য ইচ্ছা পুরোনে পথে সে আজও পারি দিচ্ছে।
জুনাইদ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বর্ষের প্রথম সেমিস্টারে প্রথম হয়েছিল । শিক্ষক ও বন্ধুদের সহযোগিতায় সে তার স্বপ্ন পুরনের পথে যাত্রা শুরু করেছে । পে ইট ফরওয়ার্ড বাংলাদেশ নামক এক সংগঠন থেকে তার বৃত্তির ব্যবস্থা করে দেয়। তাঁর এখন একটাই স্বপ্ন, প্রকৌশলী হবেন। এবং পরিবার কিংবা টাকার অভাবে শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত শিশুদের জন্য কাজ করবে।
অনুপ্রেরণার গল্প
জুনাইদ বলেছিল যে, আপনার ফোনে তো ফোন এলে বিরক্ত হন, কিন্তু আমাকে হঠাৎ কেউ যদি ফোন করে আমার কী যে ভালো লাগে তা আমি ভাষায় বোঝাতে পারব না! সে আরও বলে যে,আমার কলেজের একজন শিক্ষিকা আছে। সে মাঝেমধ্যে তাকে ফোন করে জিজ্ঞেস করেন, “রাতে কী খেয়েছ? ” তখন আমার চোখে পানি এসে যায়।
বর্তমানে আমার এখন স্থায়ী ঠিকানা শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু হল।
অনুপ্রেরণার গল্প
★তো সর্বশেষ কথা আমি একটায় বলব যে," জিবনে অনেক আপদ-বিপদ আসবে তাই বলে কখনো হাল ছারবেন না। বরং নিজের লক্ষ্য মাত্রার দিকে এগিয়ে যাবেন।"
অনুপ্রেরণার গল্প
_ধন্যবাদ__|__গল্পটি__|__পড়ার__|__জন্য_
#তো বন্ধুরা আশা করি গল্পটি নিশ্চয়ই ভালো লেগেছে।যদি ভালো লাগে তাহলে তোমার বন্ধু-বান্ধদের মাঝে আমার এই গল্পটি শেয়ার করতে পার। এবং একটি কমেন্ট করে জানাও কেমন লেগেছে!
[[আর আপনার নিজের লেখা কোনো আর্টিকেল আমাদের সাইটে
ফ্রিতে প্রকাশ করতে চান তাহলে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন। এখানে ক্লিক করুন ]]
অনুপ্রেরণার গল্প
All_is_Well latest bd news

0 Comments:
⚠️ এমন কোনো মন্তব্য করবেন না যাতে, অন্য কোনো ব্যাক্তির সমস্যা হয়।